ঢাকা    বুধবার, ২০ মে ২০২৬
আগামীর আলো

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলা যেভাবে ইরানকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে


প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলা যেভাবে ইরানকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলা যেভাবে ইরানকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে

মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এক জটিল মোড় নিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এই যুদ্ধকে সামরিক কৌশল, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বা পারমাণবিক ঝুঁকির মানদণ্ডে বিচার করা হলেও, এর গভীরে রয়েছে শিয়া রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের এক শক্তিশালী আখ্যান। 

নর্থ-ইস্ট ইউনিভার্সিটি লন্ডনের দর্শনের সহকারী অধ্যাপক হোসেইন দাব্বাগের মতে, বাহ্যিক এই চরম আঘাত ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে দেশটির অভ্যন্তরীণ সংহতিকে আরও দৃঢ় করছে।

ইরানের শাসনব্যবস্থা কেবল একটি আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, বরং এটি ‘শাহাদাত’ বা আত্মত্যাগের আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি নৈতিক প্রকল্প। ঐতিহাসিক কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগের যে স্মৃতি শিয়া চেতনায় অমলিন, বর্তমান যুদ্ধকে সেই একই ‘ন্যায় বনাম অন্যায়ের’ লড়াই হিসেবে তুলে ধরছে তেহরান। 

সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর রাতভর রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান এবং বাসিজ বাহিনীর মতো আধাসামরিক গোষ্ঠীর সদস্যদের আমৃত্যু লড়াইয়ের শপথ প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধ এখন কেবল অস্ত্রের নয়, বরং আদর্শিক টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলো মনে করেছিল প্রবল সামরিক চাপ ইরানকে ভেঙে ফেলবে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বৈদেশিক আক্রমণ ইরানিদের মধ্যে এক ধরনের ‘অবরুদ্ধ মানসিকতা’ তৈরি করেছে, যা সাধারণ জনগণের ক্ষোভকে অভ্যন্তরীণ অপশাসনের পরিবর্তে বহিরাগত শত্রুর দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। এমনকি যারা বর্তমান শাসনের সমালোচক, তারাও জাতীয়তাবাদ এবং সম্মিলিত শাস্তির ভয়ে বিজাতীয় আক্রমণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াচ্ছে। 

ফলে ইরান এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য হলো নিজেদের ধ্বংসের বিনিময়ে হলেও শত্রুর রাজনৈতিক ধৈর্য পরীক্ষা করা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণের’ দাবি এই সংকটকে আরও উসকে দিয়েছে। এটি ইরানকে এমন একটি শত্রুর ছবি আঁকতে সাহায্য করছে, যা তাদের চিরাচরিত ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী’ আখ্যানকে বৈধতা দেয়। 

সামরিকভাবে অবকাঠামো বা সেনাপতি হারালেও, রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক দিক থেকে ইরান ‘শাহাদাত’-এর নতুন ভাষা খুঁজে পাচ্ছে। এই যুদ্ধের ট্র্যাজেডি হলো, বাইরে থেকে যত বেশি আঘাত করা হচ্ছে, ইরানের ভেতরের সেই মিথ বা আদর্শিক ভিত্তি তত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ ইরানের বস্তুগত ভিত্তি দুর্বল করলেও, এর আদর্শিক টিকে থাকার গল্পকে দীর্ঘজীবী করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

আগামীর আলো

বুধবার, ২০ মে ২০২৬


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলা যেভাবে ইরানকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে

প্রকাশের তারিখ : ২৯ মার্চ ২০২৬

featured Image

মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এক জটিল মোড় নিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এই যুদ্ধকে সামরিক কৌশল, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বা পারমাণবিক ঝুঁকির মানদণ্ডে বিচার করা হলেও, এর গভীরে রয়েছে শিয়া রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের এক শক্তিশালী আখ্যান। 

নর্থ-ইস্ট ইউনিভার্সিটি লন্ডনের দর্শনের সহকারী অধ্যাপক হোসেইন দাব্বাগের মতে, বাহ্যিক এই চরম আঘাত ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে দেশটির অভ্যন্তরীণ সংহতিকে আরও দৃঢ় করছে।

ইরানের শাসনব্যবস্থা কেবল একটি আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, বরং এটি ‘শাহাদাত’ বা আত্মত্যাগের আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি নৈতিক প্রকল্প। ঐতিহাসিক কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগের যে স্মৃতি শিয়া চেতনায় অমলিন, বর্তমান যুদ্ধকে সেই একই ‘ন্যায় বনাম অন্যায়ের’ লড়াই হিসেবে তুলে ধরছে তেহরান। 

সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর রাতভর রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান এবং বাসিজ বাহিনীর মতো আধাসামরিক গোষ্ঠীর সদস্যদের আমৃত্যু লড়াইয়ের শপথ প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধ এখন কেবল অস্ত্রের নয়, বরং আদর্শিক টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলো মনে করেছিল প্রবল সামরিক চাপ ইরানকে ভেঙে ফেলবে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বৈদেশিক আক্রমণ ইরানিদের মধ্যে এক ধরনের ‘অবরুদ্ধ মানসিকতা’ তৈরি করেছে, যা সাধারণ জনগণের ক্ষোভকে অভ্যন্তরীণ অপশাসনের পরিবর্তে বহিরাগত শত্রুর দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। এমনকি যারা বর্তমান শাসনের সমালোচক, তারাও জাতীয়তাবাদ এবং সম্মিলিত শাস্তির ভয়ে বিজাতীয় আক্রমণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াচ্ছে। 

ফলে ইরান এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য হলো নিজেদের ধ্বংসের বিনিময়ে হলেও শত্রুর রাজনৈতিক ধৈর্য পরীক্ষা করা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণের’ দাবি এই সংকটকে আরও উসকে দিয়েছে। এটি ইরানকে এমন একটি শত্রুর ছবি আঁকতে সাহায্য করছে, যা তাদের চিরাচরিত ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী’ আখ্যানকে বৈধতা দেয়। 

সামরিকভাবে অবকাঠামো বা সেনাপতি হারালেও, রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক দিক থেকে ইরান ‘শাহাদাত’-এর নতুন ভাষা খুঁজে পাচ্ছে। এই যুদ্ধের ট্র্যাজেডি হলো, বাইরে থেকে যত বেশি আঘাত করা হচ্ছে, ইরানের ভেতরের সেই মিথ বা আদর্শিক ভিত্তি তত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ ইরানের বস্তুগত ভিত্তি দুর্বল করলেও, এর আদর্শিক টিকে থাকার গল্পকে দীর্ঘজীবী করতে পারে।


আগামীর আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: আসাদুজ্জামান
কপিরাইট © ২০২৫ আগামীর আলো