চীনকে সাধারণত সুপারপাওয়ার হিসেবেই ধরা হয়। বহু সূচকে সেটি সত্যও। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে চীন বিশ্বের দ্বিতীয়। ক্রয়ক্ষমতা সমতা বা পিপিপি হিসাবে পরিমাপ করলে চীন প্রথম। দেশটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার বেশ বড় এবং ক্রমবর্ধমান। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন। টানা তিন দশকের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও চীন ‘উচ্চ আস্থার’ সমাজ হিসেবে চরিত্র হারায়নি।
তবে সুপারপাওয়ারকে কেবল উপাধিতে নয়, কাজেও প্রমাণিত হতে হয়। প্রকৃত সুপারপাওয়ার নিজেদের স্বার্থ রক্ষা বা এগিয়ে নিতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে। মার্কিন প্রশাসন ইরানকে হুমকি দিচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর এবার তারা নতুন ধাপের আক্রমণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওই হামলায় বহু ইরানি নেতা নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। এখন আমেরিকার লক্ষ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। ইরান বলেছে, ক্ষেপণাস্ত্র তাদের একমাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাই এটি আলোচনার বিষয় নয়। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ‘ডাউনব্লেন্ড’ বা নিম্নমাত্রায় রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি।
কিছু পশ্চিমা পর্যবেক্ষক মনে করেন, মার্কিন–ইসরায়েলি আক্রমণের মুখে দুর্বল ইরানকে সহায়তায় চীন ও রাশিয়া কিছুই করবে না। কিন্তু বেইজিং ও মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। চীন সরাসরি আমেরিকার সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। তারা মনে করে, সে সময় পরে আসবে। তবে ইরান ও আশপাশের অঞ্চলে চীনের বড় স্বার্থ রয়েছে। তাই বিনিয়োগ ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের সুনাম রক্ষায় তাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানে হামলা করলে রাশিয়া ও চীনের আইনি বাধ্যবাধকতা নেই ইরানকে রক্ষা করার। কারণ তাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিন দেশ একটি ত্রিপক্ষীয় কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর লক্ষ্য রাজনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক সংহতি গভীর করা।
রাশিয়া ও ইরান ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২০ বছরের ‘সমগ্র কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ করেছে। এতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, অস্ত্র বিক্রি এবং অভিন্ন হুমকি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় হতে পারে। ইউক্রেনে যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া ব্যস্ত। তবু তারা ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা ও অস্ত্র পাঠাতে বাধ্য বোধ করতে পারে। কারণ ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন ইউক্রেনে ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তা দিয়েছে। মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রাশিয়া ও ইরান ৫৮৯ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে। এতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের কথা রয়েছে। তবে সম্ভাব্য আসন্ন সংঘর্ষের আগে সেই সহায়তা পৌঁছাবে না।
চীনের অবস্থান আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা করলে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চীন-ইরান ২৫ বছরের কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি হুমকির মুখে পড়বে। ঝুঁকিতে পড়বে ৬০ বিলিয়ন ডলারের চায়না–পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর। এটি ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ অবকাঠামো নেটওয়ার্ক। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের প্রধান স্তম্ভ এটি। চীন ইরানের রপ্তানিকৃত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে। আর তাদের মোট তেল আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশ আসে ইরান থেকে। চীন-ইরান রেলপথ সমুদ্রপথের তুলনায় ৫০ শতাংশ দ্রুত। এতে সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ বা চোকপয়েন্ট এড়ানো যায়। ভবিষ্যতে ‘ফাইভ ন্যাশনস রেলওয়ে করিডর’ মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তান হয়ে চীনকে ইরানের সঙ্গে যুক্ত করবে।
ভূরাজনীতি বিশ্লেষক নভরূপ সিং বলেন, ২০২৫ সালের জুনের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলাকে এখন চীন আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে দেখছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চীনের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক স্বার্থে। ওই হামলার পর ইরানের সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জিপিএস ত্যাগ করে চীনের বেইডুয়ো স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন সিস্টেম গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সফটওয়্যারের বদলে চীনা সিস্টেম ব্যবহার করছে। সলিড ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত অ্যামোনিয়াম পারক্লোরেট চীন থেকে আমদানি করেছে। জানা গেছে, ইরান দূরপাল্লার ওয়াইএলসি-৮বি অ্যান্টি-স্টেলথ রাডার এবং এইচকিউ-৯বি দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।

সোমবার, ১১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
চীনকে সাধারণত সুপারপাওয়ার হিসেবেই ধরা হয়। বহু সূচকে সেটি সত্যও। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে চীন বিশ্বের দ্বিতীয়। ক্রয়ক্ষমতা সমতা বা পিপিপি হিসাবে পরিমাপ করলে চীন প্রথম। দেশটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার বেশ বড় এবং ক্রমবর্ধমান। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন। টানা তিন দশকের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও চীন ‘উচ্চ আস্থার’ সমাজ হিসেবে চরিত্র হারায়নি।
তবে সুপারপাওয়ারকে কেবল উপাধিতে নয়, কাজেও প্রমাণিত হতে হয়। প্রকৃত সুপারপাওয়ার নিজেদের স্বার্থ রক্ষা বা এগিয়ে নিতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে। মার্কিন প্রশাসন ইরানকে হুমকি দিচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর এবার তারা নতুন ধাপের আক্রমণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওই হামলায় বহু ইরানি নেতা নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। এখন আমেরিকার লক্ষ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। ইরান বলেছে, ক্ষেপণাস্ত্র তাদের একমাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাই এটি আলোচনার বিষয় নয়। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ‘ডাউনব্লেন্ড’ বা নিম্নমাত্রায় রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি।
কিছু পশ্চিমা পর্যবেক্ষক মনে করেন, মার্কিন–ইসরায়েলি আক্রমণের মুখে দুর্বল ইরানকে সহায়তায় চীন ও রাশিয়া কিছুই করবে না। কিন্তু বেইজিং ও মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। চীন সরাসরি আমেরিকার সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। তারা মনে করে, সে সময় পরে আসবে। তবে ইরান ও আশপাশের অঞ্চলে চীনের বড় স্বার্থ রয়েছে। তাই বিনিয়োগ ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের সুনাম রক্ষায় তাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানে হামলা করলে রাশিয়া ও চীনের আইনি বাধ্যবাধকতা নেই ইরানকে রক্ষা করার। কারণ তাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিন দেশ একটি ত্রিপক্ষীয় কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর লক্ষ্য রাজনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক সংহতি গভীর করা।
রাশিয়া ও ইরান ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২০ বছরের ‘সমগ্র কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ করেছে। এতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, অস্ত্র বিক্রি এবং অভিন্ন হুমকি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় হতে পারে। ইউক্রেনে যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া ব্যস্ত। তবু তারা ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা ও অস্ত্র পাঠাতে বাধ্য বোধ করতে পারে। কারণ ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন ইউক্রেনে ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তা দিয়েছে। মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রাশিয়া ও ইরান ৫৮৯ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে। এতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের কথা রয়েছে। তবে সম্ভাব্য আসন্ন সংঘর্ষের আগে সেই সহায়তা পৌঁছাবে না।
চীনের অবস্থান আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা করলে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চীন-ইরান ২৫ বছরের কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি হুমকির মুখে পড়বে। ঝুঁকিতে পড়বে ৬০ বিলিয়ন ডলারের চায়না–পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর। এটি ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ অবকাঠামো নেটওয়ার্ক। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের প্রধান স্তম্ভ এটি। চীন ইরানের রপ্তানিকৃত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে। আর তাদের মোট তেল আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশ আসে ইরান থেকে। চীন-ইরান রেলপথ সমুদ্রপথের তুলনায় ৫০ শতাংশ দ্রুত। এতে সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ বা চোকপয়েন্ট এড়ানো যায়। ভবিষ্যতে ‘ফাইভ ন্যাশনস রেলওয়ে করিডর’ মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তান হয়ে চীনকে ইরানের সঙ্গে যুক্ত করবে।
ভূরাজনীতি বিশ্লেষক নভরূপ সিং বলেন, ২০২৫ সালের জুনের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলাকে এখন চীন আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে দেখছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চীনের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক স্বার্থে। ওই হামলার পর ইরানের সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জিপিএস ত্যাগ করে চীনের বেইডুয়ো স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন সিস্টেম গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সফটওয়্যারের বদলে চীনা সিস্টেম ব্যবহার করছে। সলিড ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত অ্যামোনিয়াম পারক্লোরেট চীন থেকে আমদানি করেছে। জানা গেছে, ইরান দূরপাল্লার ওয়াইএলসি-৮বি অ্যান্টি-স্টেলথ রাডার এবং এইচকিউ-৯বি দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।

আপনার মতামত লিখুন