সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনের বাইরে গিয়ে তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের ইচ্ছামতো রায় না দেওয়ায় ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হতে হয়েছিল সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকারকে। ড. আবুল হোসেন খন্দকার ঢাকা -১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাকের বড় ভাই।দীর্ঘ প্রায় চার দশক বিচার বিভাগে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনচেতা বিচারক বর্তমানে ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাকের আপন বড় ভাই।সম্প্রতি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের নানা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ও রোষানল নিয়ে আলোচনার মাঝে এই সৎ ও নির্ভীক বিচারকের ওপর নেমে আসা অন্যায়ের ঘটনাটি নতুন করে সামনে এসেছে।ঘটনাটি ২০১১ সালের, যখন ড. আবুল হোসেন খন্দকার ফেনী জেলায় কর্মরত ছিলেন। সে সময় তৎকালীন ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও যুবলীগ নেতা একরামুল হকের বিরুদ্ধে একটি নির্বাচন-সংক্রান্ত মামলা তার আদালতে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। মামলার বিবাদী একরামুল হক ছিলেন তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের আত্মীয়।ড. আবুল হোসেন খন্দকার জানান, রায় ঘোষণার আগে তাকে তিন দফা সচিবালয়ে ডেকে পাঠান কামরুল ইসলাম। তিনি চাপ প্রয়োগ করে তার আত্মীয়ের পক্ষে রায় দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং বিনিময়ে তাকে ঢাকায় কাঙ্ক্ষিত পোস্টিং দেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে একজন ন্যায়নিষ্ঠ বিচারক হিসেবে তিনি প্রতিমন্ত্রীর এই অনৈতিক প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সাফ জানিয়ে দেন যে, আইনের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।রায়ের দিনও মন্ত্রী তার ব্যক্তিগত ও সরকারি টেলিফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এমনকি এজলাসে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে ফেনী জেলা আদালতের তৎকালীন পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) মোবাইল ফোনের মাধ্যমেও মন্ত্রী তাকে নির্দেশমতো রায় দেওয়ার জন্য বলেন।সব ধরনের রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে বিচারক ড. আবুল হোসেন মামলার নথি, সাক্ষ্য ও আইনের ভিত্তিতে একরামুল হকের বিরুদ্ধে রায় প্রদান করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মন্ত্রী কামরুল ইসলাম। সেই রায়ের মাত্র তিন দিনের মাথায় কোনো ধরনের শোকজ নোটিশ ছাড়াই একটি সাজানো অভিযোগের ভিত্তিতে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারককে ওএসডি করা হয়।মন্ত্রণালয়ের এই অন্যায় আদেশের বিরুদ্ধে দমে যাননি ড. আবুল হোসেন খন্দকার। তিনি সরকারের এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে মহামান্য হাইকোর্ট তার ওএসডি আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করে তার পক্ষে রায় দেন। পরবর্তীতে আপিল বিভাগেও হাইকোর্টের দেওয়া এই আদেশ বহাল থাকে।ড. আবুল হোসেন খন্দকার আক্ষেপ করে বলেন,“এর আগে কোনো সরকারের সময় বিচারকদের এভাবে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী রায়ের জন্য চাপ দেননি। তদবির থাকলেও বলা হতো বিষয়টি একটু দেখবেন, যেন ন্যায়বিচার হয়। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।”স্কুলজীবন থেকেই দেশের মানুষকে অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্ত করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, কর্মজীবনে শত চাপের মুখেও তিনি সেই সততা ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।